ভূমিকা : উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি। এদেশের অনেক গুণী কথাসাহিত্যিকগণ বাংলা উপন্যাস রচনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আর বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তাঁরা এসব উপন্যাস রচনা করেন। তাঁরা মনে করেন বাঙালি জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ এক শৈল্পিক অর্জন। তাইতো তাঁরা তাঁদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অনুষঙ্গ ফুটিয়ে তুলেছেন। নিম্নে প্রশ্নালোকে আলোচনা করা হলো :
বাংলা যেসব উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ আলোচিত : মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আনন্দ-বেদনার কনকপদ্ম। আমাদের বাংলা সাহিত্যের বিশাল দিগন্তে মুক্তিযুদ্ধের প্রবল উপস্থিতি তেমন নেই। আজও মুক্তিযুদ্ধের বেদনাগীতি তেমনভাবে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়নি, যেমনটি হওয়া উচিত ছিল। তবুও আমাদের যে কয়েকজন ঔপন্যাসিক তাঁদের শিল্পকর্মে মুক্তিযুদ্ধের যে ভাষ্যচিত্র অঙ্কন করেছেন তা অকিঞ্চিৎকর নয়। তাঁদের সে ভাষ্যচিত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত করেছে। আমাদের গৌরবকে করেছে দীপান্বিত। নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে এসব উপন্যাসের গুরুত্ব সর্বাধিক। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সেই ভয়াল রাতের ভয়াল চিত্র থেকে বাংলাদেশে বিশেষত ঢাকা নগরী যখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে সেই দুঃস্বপ্নের নগরীতে বসে শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের যাত্রা। দুঃস্বপ্নের রাত কেটে গিয়ে পরম আকাঙ্ক্ষিত সকালের আগেই ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশা স্বাধীনতার বেদীমূলে উৎসর্গ করে গেছেন নিজেকে।
তাছাড়া বাংলাদেশের উপন্যাসে উঠে এসেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক এদেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাশবিক নির্যাতনের চিত্র। পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-অবিচারে ঢাকা নগরী যে শ্মশানে পরিণত হয়েছে তার চিত্র। রুটি-রুজির সংগ্রামরত এদেশের মানুষের বুকের ওপর পশুরা অস্ত্র ধরেছে। এদেশের মা-বোনদের ওপর চালিয়েছে অকথ্য নির্যাতন। তাদের চিন্তাধারা ছিল রুটি খেয়ে শরীরে শক্তি বাড়াও, বাঙালির ওপর অস্ত্র ধরে তাদেরকে হত্যা কর। এমনকি তাদের স্ত্রী-কন্যাদের ভোগ কর। নারী নির্যাতনের এমন সব দৃশ্য একই সাথে মর্মন্তুদ ও বেদনাসঞ্চারী। বাঙালিকে বুট আর বুলেটের আঘাতে বিদ্ধ করেই তাদের আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি ঘটেনি। স্বাধীনতাস্পৃহী এদেশের আবালবৃদ্ধ বণিতাকে অভিনব কায়দায় শাস্তির ব্যবস্থা করে এক নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। একটি সিভিল সাপ্লাইয়ের গোডাউনের মধ্যে প্রায় শতাধিক নারীকে ধরে এনে পাক হানাদার বাহিনী উলঙ্গ করে রাখতো এবং তাদের ওপর চালাতো পাশবিক নির্যাতন এবং প্রত্যেক নারীর ওপর দৈহিক নির্যাতন চালাতো।
মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গে রচিত উপন্যাসগুলো হলো :
১. আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’।
২. শওকত ওসমানের ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’।
৩. শওকত ওসমানের ‘নেকড়ে অরণ্য’।
৪. শওকত ওসমানের ‘জলাঙ্গী’।
৫. শওকত ওসমানের ‘দুই সৈনিক’।
৬. শওকত আলীর ‘যাত্রা’।
৭. মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’।
৮. রেজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষরে’।
৯. সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’।
১০. আমজাদ হোসেনের ‘অবেলায় অসময়’।
১১. শাহরিয়ার কবিরের ‘পূর্বের সূর্য’।
১২. সৈয়দ শামসুল হকের ‘নীল দংশন’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’।
১৩. রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’।
১৪. হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’।
১৫. হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’।
১৬. রাবেয়া খাতুনের ‘মেঘের পরে মেঘ’ প্রভৃতি উপন্যাস।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত এসব উপন্যাস দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, হিংস্রতা, ঐক্যবদ্ধতা, বাঙালির আত্মত্যাগ, পশুদের অত্যাচার, জাতির চাওয়া-পাওয়ার অনুপম দৃশ্য খুব সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।
উপরের প্রশ্নত্তরটির সম্ভাব্য বিকল্প প্রশ্ন সমূহ:
- বাংলাদেশের যেসব উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ আলোচিত হয়েছে তা আলোচনা কর।
- বাংলা উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা কর।
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস কী কী?
