প্রশ্ন : ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের বিষয় ভাবনা আলোচনা কর।
অথবা, ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত বাংলা উপন্যাসের মূল বিষয় কী ছিল? সংক্ষেপে আলোচনা কর।
অথবা, ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ বাংলা উপন্যাসের বিষয় ভাবনা বর্ণনা কর।
উত্তর :
ভূমিকা : বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে উপন্যাস সাহিত্য। বাংলা উপন্যাস সাহিত্য এমন এক অংশ যাতে প্রায় প্রত্যেক লেখকরাই রসাস্বাদন করতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে এতে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন, দেশ বিভাগের চিত্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, মহামারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। নিম্নে প্রশ্নালোকে আলোচনা করা হলো :
১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলা উপন্যাসের বিষয় ভাবনা :
উপন্যাস সাহিত্যের অন্যতম মূল বিষয়। উপন্যাসের মাধ্যমে সমকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া বাস্তবিক চিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়। তাইতো ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ে এদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা বিভিন্ন ঔপন্যাসিকগণ তাদের উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। যেমন— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যান্য উপনিবেশ শৃঙ্খলিত রাষ্ট্র অপেক্ষা পাকিস্তান শাসিত বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো ও জনজীবন রূপ ছিল স্বতন্ত্র ধারায় বহমান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনেও সূচিত হয় ইতিবাচক আলোড়ন। কিন্তু ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন জাতীয় চৈতন্যের সেই সূর্যমুখী অভিযাত্রাকে গভীরভাবে অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার গহ্বরে নিক্ষেপ করে। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, মহামারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উন্মূলিত অস্তিত্ব, গ্রামীণ জনস্রোতের নগরমুখিতা, দেশ বিভাগে উদ্বাস্তু সমস্যা প্রভৃতি এই ভূখণ্ডের জীবনবিন্যাসকে করে জটিল ও দ্বন্দ্বময়। কিন্তু মন্থরভাবে হলেও সামাজিক গতির অন্তঃশীলা প্রবাহ আধা সামন্তবাদী মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে গ্রামীণ জীবনের আবহমান আর্থসামাজিক উৎপাদন কাঠামো নবতর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। প্রচলিত মূল্যবোধ, সামন্ত ধ্যানধারণা, মানুষের অস্তিত্ব বিষয়ক উদ্বেগ ও জিজ্ঞাসা, অনিবার্য সংঘাতও পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়।
গ্রামীণ জীবনের নিশ্চল পটভূমিকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় আধুনিক শিক্ষাবিস্তারের। আর এরই ফলে গোষ্ঠীচেতনা অপেক্ষা শ্রেণিগত সংঘচেতনার প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়। এতে আধুনিক শিক্ষার অভিঘাত, তরুণ মানসে অধিকারবোধ, গণচেতনা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সচেতনতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ ও মানবতাবাদী শিল্পচেতনার প্রয়াসকে অনিবার্য করে তোলে। এই বাংলা গ্রামীণ ভূখণ্ড হওয়ায় এদেশের গ্রামীণ উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সন্তান ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল অংশ। যে কারণে গ্রামীণ জীবনচেতনার সাথে শুধু ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের ন্যায় যন্ত্র সভ্যতার কল্যাণে আন্তর্জাতিক পটভূমিও সংযোগ সাধিত হয়। একে অপরের মধ্যে সৃষ্টি হয় মেলবন্ধন। এভাবে ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলা উপন্যাসে বাংলাদেশ ও বাঙালির বিচিত্র চিত্র ফুটে উঠে। আর এটাই হলো তৎকালীন উপন্যাসের মূল বিষয়।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময় উপন্যাস সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে এ সময় বাংলা উপন্যাসের পালাবদল ঘটে। তখন থেকে শুরু হয় বাংলা উপন্যাস রচনার প্রতিযোগিতা। তৎকালীন সময়ে পূর্ব বাংলার চিত্র, এদেশের মানুষের চালচিত্র, তাদের দুঃখ-কষ্টের চিত্র এমন সব ধরনের ঘটনা উল্লেখ করাই এই সময়কার উপন্যাসের মূল বিষয়।
